১. স্থিতিস্থাপকতা (Elasticity)
বাহ্যিক বল প্রয়োগ করে কোনো বস্তুর আকার বা আয়তন পরিবর্তনের চেষ্টা করলে যে ধর্মের কারণে বস্তুটি সেই বিকৃতির বিরুদ্ধে বাধা প্রদান করে এবং বল অপসারিত হলে পূর্বের আকার ও আয়তন ফিরে পায়, তাকে স্থিতিস্থাপকতা বলে।
- স্থিতিস্থাপক সীমা (Elastic Limit): প্রযুক্ত বলের যে সর্বোচ্চ মান পর্যন্ত কোনো বস্তু পূর্ণ স্থিতিস্থাপক আচরণ করে এবং বল সরালে আদি অবস্থায় ফিরে আসে, তাকে স্থিতিস্থাপক সীমা বলে। এই সীমার বেশি বল প্রয়োগ করলে বস্তুতে স্থায়ী বিকৃতি ঘটে।
- বিকৃতি (Strain): বাহ্যিক বলের প্রভাবে বস্তুর একক মাত্রায় যে পরিবর্তন ঘটে, তাকে বিকৃতি বলে। দৈর্ঘ্য বিকৃতি = rac{Delta L}{L}। বিকৃতি দুটি একই জাতীয় রাশির অনুপাত হওয়ায় এর কোনো একক বা মাত্রা নেই।
- পীড়ন (Stress): বিকৃতির বিরুদ্ধে বস্তুর ভেতরে প্রতি একক ক্ষেত্রফলে যে প্রত্যয়নী বল (Restoring Force) উৎপন্ন হয়, তাকে পীড়ন বলে। পীড়ন = rac{F}{A}। এর একক বা এবং মাত্রা ।
২. হুকের সূত্র ও ইয়ং-এর গুণাঙ্ক (Hooke's Law & Young's Modulus)
১৬৭৮ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke) স্থিতিস্থাপকতার মূল সূত্র প্রদান করেন:
"স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে বস্তুর পীড়ন তার বিকৃতির সমানুপাতিক।"
পীড়ন বিকৃতি
এই ধ্রুবককে বস্তুর উপাদানের স্থিতিস্থাপক গুণাঙ্ক (Modulus of Elasticity) বলে। দৈর্ঘ্য বিকৃতির ক্ষেত্রে একে ইয়ং-এর গুণাঙ্ক (Young's Modulus, ) বলে।
ইয়ং-এর গুণাঙ্কের সমীকরণ (Young's Modulus)
একক: এসআই একক: N/m² বা Pa, মাত্রা: [Y] = ML⁻¹T⁻²চলকের পরিচয় ও অর্থ
Y: ইয়ং-এর গুণাঙ্ক (Young's Modulus, N/m² বা Pa), F: প্রযুক্ত বল বা ওজন (mg, N), L: আদি দৈর্ঘ্য (Initial length, m), ΔL: দৈর্ঘ্যের বৃদ্ধি বা পরিবর্তন (m), A: তারের প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (πr², m²), r: তারের ব্যাসার্ধ (m)
ইস্পাত ও রবারের মধ্যে কোনটি বেশি স্থিতিস্থাপক?
সাধারণ ধারণায় রবার বেশি স্থিতিস্থাপক মনে হলেও পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ইস্পাত রবারের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক।
কারণ একই দৈর্ঘ্যের ও প্রস্থচ্ছেদের একটি রবারের তার এবং একটি ইস্পাতের তারে সমান পরিমাণ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি () ঘটাতে ইস্পাতের ক্ষেত্রে বহুগুণ বেশি বল () এবং পীড়ন প্রয়োজন হয়। সমীকরণ অনুযায়ী যার বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বল যত বেশি, তার ইয়ং-এর গুণাঙ্ক তত বেশি। ইস্পাতের , যা রবারের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি!
কারণ একই দৈর্ঘ্যের ও প্রস্থচ্ছেদের একটি রবারের তার এবং একটি ইস্পাতের তারে সমান পরিমাণ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি () ঘটাতে ইস্পাতের ক্ষেত্রে বহুগুণ বেশি বল () এবং পীড়ন প্রয়োজন হয়। সমীকরণ অনুযায়ী যার বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বল যত বেশি, তার ইয়ং-এর গুণাঙ্ক তত বেশি। ইস্পাতের , যা রবারের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি!
৩. পদার্থের চতুর্থ অবস্থা: প্লাজমা (Plasma)
কঠিন, তরল ও বায়বীয় ছাড়াও পদার্থের আরও একটি অবস্থা রয়েছে, যার নাম প্লাজমা।
- অতি উচ্চ তাপমাত্রায় (কয়েক হাজার থেকে লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস) গ্যাসের পরমাণুগুলো থেকে ইলেকট্রন বিচ্ছিন্ন হয়ে ধনাত্মক আয়ন এবং মুক্ত ইলেকট্রনের একটি তড়িৎ পরিবাহী গ্যাসীয় মিশ্রণ তৈরি করে। এই আয়নিত অবস্থাই হলো প্লাজমা।
- সূর্য ও নক্ষত্রের মূল উপাদান হলো প্লাজমা। মহাবিশ্বের দৃশ্যমান পদার্থের প্রায় ৯৯%-ই প্লাজমা অবস্থায় রয়েছে।
- পৃথিবীতে বজ্রপাতের সময় বায়ু আয়নিত হয়ে ক্ষণিকের জন্য প্লাজমা তৈরি হয়। এছাড়া নিয়ন সাইন বাতি এবং ফ্লাট প্লাজমা ডিসপ্লে টিভিতে প্লাজমা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
৪. এসএসসি বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড সৃজনশীল প্রশ্নব্যাংক (Board CQ & MCQ)
সৃজনশীল প্রশ্ন ১ [বোর্ড মানদণ্ড]: একটি হাইড্রোলিক প্রেসের ছোট ও বড় পিস্টনের ব্যাস যথাক্রমে 10 cm ও 50 cm। ছোট পিস্টনে 200 N বল প্রয়োগ করা হলো। (ক) প্যাসকেলের সূত্রটি লেখ। (খ) নদী অপেক্ষা সাগরে সাঁতার কাটা সহজ কেন? (গ) বড় পিস্টনটি কত ঊর্ধ্বমুখী বল অনুভব করবে? (ঘ) পিস্টনদ্বয়ের কৃতকাজের পরিমাণ সমান কি না—গাণিতিকভাবে যাচাই কর।
(ক) প্যাসকেলের সূত্র: আবদ্ধ পাত্রে তরল বা গ্যাসীয় পদার্থের ওপর বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগ করলে সেই চাপ কিছুমাত্র না কমে সবদিকে সমানভাবে সঞ্চালিত হয় এবং পাত্রের সংলগ্ন গায়ে লম্বভাবে কাজ করে।
(খ) সাগরে সাঁতার কাটা সহজ কেন: সাগরের পানিতে প্রচুর খনিজ লবণ দ্রবীভূত থাকায় এর ঘনত্ব নদীর মিষ্টি পানির চেয়ে বেশি ()। প্লবতার সমীকরণ অনুযায়ী তরলের ঘনত্ব বেশি হলে প্লবতা বল বেশি পাওয়া যায়। ফলে সাগরের পানিতে মানুষের শরীরের ওপর বেশি ঊর্ধ্বমুখী প্লবতা কাজ করায় শরীর সহজে ভেসে থাকে এবং সাঁতার কাটা সহজ হয়।
(গ) বড় পিস্টনের ঊর্ধ্বমুখী বল :
আমরা জানি,
এখানে , ,
।
অর্থাৎ বড় পিস্টনে প্রাপ্ত বল ।
(ঘ) কৃতকাজের সমতা যাচাই:
ধরা যাক ছোট পিস্টন দূরত্ব নিচে নামলে বড় পিস্টন দূরত্ব ওপরে ওঠে।
আবদ্ধ তরলের অপসারিত আয়তন সমান থাকায়:
ছোট পিস্টনে প্রযুক্ত কাজ
বড় পিস্টনে কৃতকাজ
অতএব । অর্থাৎ উভয় পিস্টনে কৃতকাজের পরিমাণ সমান এবং যন্ত্রটি শক্তির নিত্যতা নীতি পুরোপুরি মেনে চলে।
(খ) সাগরে সাঁতার কাটা সহজ কেন: সাগরের পানিতে প্রচুর খনিজ লবণ দ্রবীভূত থাকায় এর ঘনত্ব নদীর মিষ্টি পানির চেয়ে বেশি ()। প্লবতার সমীকরণ অনুযায়ী তরলের ঘনত্ব বেশি হলে প্লবতা বল বেশি পাওয়া যায়। ফলে সাগরের পানিতে মানুষের শরীরের ওপর বেশি ঊর্ধ্বমুখী প্লবতা কাজ করায় শরীর সহজে ভেসে থাকে এবং সাঁতার কাটা সহজ হয়।
(গ) বড় পিস্টনের ঊর্ধ্বমুখী বল :
আমরা জানি,
এখানে , ,
।
অর্থাৎ বড় পিস্টনে প্রাপ্ত বল ।
(ঘ) কৃতকাজের সমতা যাচাই:
ধরা যাক ছোট পিস্টন দূরত্ব নিচে নামলে বড় পিস্টন দূরত্ব ওপরে ওঠে।
আবদ্ধ তরলের অপসারিত আয়তন সমান থাকায়:
ছোট পিস্টনে প্রযুক্ত কাজ
বড় পিস্টনে কৃতকাজ
অতএব । অর্থাৎ উভয় পিস্টনে কৃতকাজের পরিমাণ সমান এবং যন্ত্রটি শক্তির নিত্যতা নীতি পুরোপুরি মেনে চলে।
সৃজনশীল প্রশ্ন ২ [বোর্ড মানদণ্ড]: আয়তনের একটি বস্তুর বাতাসে ওজন । বস্তুটিকে পানিতে ডুবানো হলো (পানির ঘনত্ব )। (ক) প্লবতা কাকে বলে? (খ) পারদস্তম্ভের উচ্চতা হঠাৎ কমে যাওয়া কিসের ইঙ্গিত দেয়? (গ) উদ্দীপকের বস্তুটির উপাদানের ঘনত্ব নির্ণয় কর। (ঘ) উদ্দীপকের বস্তুটিকে পানিতে ছেড়ে দিলে তা ভাসবে না ডুববে—গাণিতিক যুক্তিসহ বিশ্লেষণ কর।
(ক) প্লবতা: নিমজ্জিত বস্তুর ওপর তরল কর্তৃক প্রযুক্ত লব্ধি ঊর্ধ্বমুখী বলকে প্লবতা বলে।
(খ) পারদের উচ্চতা হঠাৎ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত: পারদস্তম্ভ হঠাৎ দ্রুত নেমে গেলে বোঝায় ওই অঞ্চলের বায়ুর চাপ খুব দ্রুত হ্রাস পেয়ে একটি গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য চারপাশের উচ্চচাপযুক্ত অঞ্চল থেকে তীব্র বেগে বাতাস ছুটে আসবে, যা আসন্ন প্রবল ঝড় বা সাইক্লোনের পূর্বাভাস।
(গ) বস্তুটির ঘনত্ব নির্ণয়:
বস্তুর বাতাসে ওজন , অভিকর্ষজ ত্বরণ
বস্তুর ভর
বস্তুর আয়তন
অতএব বস্তুর ঘনত্ব ।
(ঘ) বস্তুটির ভাসা বা ডোবার বিশ্লেষণ:
পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত অবস্থায় বস্তুটির অপসারিত পানির ওজন (প্লবতা বল):
দেখা যাচ্ছে, বস্তুর নিজস্ব ওজন () তরল কর্তৃক সর্বোচ্চ প্লবতা বল ()-এর চেয়ে অনেক বেশি ()।
আবার ঘনত্বের বিচারেও বস্তুটির ঘনত্ব () পানির ঘনত্বের () চেয়ে ৫ গুণ বেশি ()।
যেহেতু নিম্নমুখী অভিকর্ষ বল ঊর্ধ্বমুখী প্লবতার চেয়ে বেশি, তাই বস্তুটি পানিতে ছেড়ে দিলে তা সম্পূর্ণ ডুবে যাবে (Sink)।
(খ) পারদের উচ্চতা হঠাৎ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত: পারদস্তম্ভ হঠাৎ দ্রুত নেমে গেলে বোঝায় ওই অঞ্চলের বায়ুর চাপ খুব দ্রুত হ্রাস পেয়ে একটি গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য চারপাশের উচ্চচাপযুক্ত অঞ্চল থেকে তীব্র বেগে বাতাস ছুটে আসবে, যা আসন্ন প্রবল ঝড় বা সাইক্লোনের পূর্বাভাস।
(গ) বস্তুটির ঘনত্ব নির্ণয়:
বস্তুর বাতাসে ওজন , অভিকর্ষজ ত্বরণ
বস্তুর ভর
বস্তুর আয়তন
অতএব বস্তুর ঘনত্ব ।
(ঘ) বস্তুটির ভাসা বা ডোবার বিশ্লেষণ:
পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত অবস্থায় বস্তুটির অপসারিত পানির ওজন (প্লবতা বল):
দেখা যাচ্ছে, বস্তুর নিজস্ব ওজন () তরল কর্তৃক সর্বোচ্চ প্লবতা বল ()-এর চেয়ে অনেক বেশি ()।
আবার ঘনত্বের বিচারেও বস্তুটির ঘনত্ব () পানির ঘনত্বের () চেয়ে ৫ গুণ বেশি ()।
যেহেতু নিম্নমুখী অভিকর্ষ বল ঊর্ধ্বমুখী প্লবতার চেয়ে বেশি, তাই বস্তুটি পানিতে ছেড়ে দিলে তা সম্পূর্ণ ডুবে যাবে (Sink)।
পাঠ ৬: এক নজরে মূল পয়েন্ট
- হুকের সূত্র: স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে পীড়ন বিকৃতির সমানুপাতিক (পীড়ন / বিকৃতি = ধ্রুবক)।
- ইয়ং-এর গুণাঙ্ক , একক বা । ইস্পাতের স্থিতিস্থাপকতা রবারের চেয়ে অনেক বেশি।
- বিকৃতির কোনো একক বা মাত্রা নেই কারণ এটি দুটি একই জাতীয় রাশির অনুপাত। পীড়নের একক প্যাস্কেল (Pa)।
- প্লাজমা হলো অতি উচ্চ তাপমাত্রায় আয়নিত কণার গ্যাসীয় মিশ্রণ, যা পদার্থের ৪র্থ অবস্থা এবং মহাবিশ্বের অধিকাংশ উপাদান।