একটি বস্তু যখন অন্য একটি বস্তুর সংস্পর্শে থেকে গতিশীল হয় বা হতে চেষ্টা করে, তখন তাদের স্পর্শতলে গতির বিরুদ্ধে যে বাধার সৃষ্টি হয়, তাকে ঘর্ষণ (Friction) বলে। ঘর্ষণ মূলত ৪ প্রকার: স্থিতি, পিছলানো, আবর্ত এবং প্রবাহী ঘর্ষণ।
১. ঘর্ষণের উৎপত্তি ও কারণ
বাইরে থেকে দেখতে যতই মসৃণ মনে হোক না কেন, যেকোনো কঠিন বস্তুর পৃষ্ঠদেশকে মাইক্রোস্কোপে দেখলে অসংখ্য সূক্ষ্ম খাঁজ বা অমসৃণ খাঁজকাটা চূড়া দেখা যায়। দুটি তল যখন পরস্পরের সংস্পর্শে আসে, তখন এই খাঁজগুলো পরস্পরের সাথে আটকে গিয়ে বাধার সৃষ্টি করে—এটাই ঘর্ষণ বলের মূল কারণ।
২. ঘর্ষণের ৪টি প্রকারভেদ (Types of Friction)
ঘর্ষণের ৪টি প্রধান শ্রেণিবিভাগ
১. স্থিতি ঘর্ষণ (Static Friction)
স্থির অবস্থাদুটি বস্তু পরস্পরের সংস্পর্শে স্থির থাকা অবস্থায় বল প্রয়োগ করলেও যদি গতি সৃষ্টি না হয়। স্থিতি ঘর্ষণের সর্বোচ্চ মানকে সীমান্তিক ঘর্ষণ বলে।
২. পিছলানো বা গতীয় ঘর্ষণ (Sliding Friction)
পিছলে চলাযখন একটি বস্তু অন্য একটি তলের উপর পিছলে বা ঘষে চলে। উদাহরণ: মেঝের ওপর দিয়ে ভারী বাক্স টেনে নিয়ে যাওয়া।
৩. আবর্ত ঘর্ষণ (Rolling Friction)
গড়ানো বা চাকাযখন কোনো বস্তু অন্য একটি তলের ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলে। চাকা ব্যবহারের কারণে আবর্ত ঘর্ষণের মান পিছলানো ঘর্ষণের চেয়ে বহুগুণ কম হয়।
৪. প্রবাহী ঘর্ষণ (Fluid Friction)
তরল ও গ্যাসতরল বা বায়বীয় পদার্থের (প্রবাহী) মধ্য দিয়ে কোনো বস্তু গতিশীল হলে যে বাধা অনুভূত হয়। উদাহরণ: বাতাসে প্যারাস্যুট নিয়ে নামা, পানিতে মাছের সাঁতার।
৩. ঘর্ষণ কমানো ও বাড়ানোর উপায়
ঘর্ষণ কমানোর উপায়:
- পৃষ্ঠতলকে পলিশ বা অত্যন্ত মসৃণ করা।
- তৈল, গ্রিজ বা মোবিল-জাতীয় লুব্রিকেন্ট (পিচ্ছিলকারী পদার্থ) ব্যবহার।
- চাকা বা স্টিলের বল বিয়ারিং (Ball Bearing) ব্যবহার করে পিছলানো ঘর্ষণকে আবর্ত ঘর্ষণে রূপান্তর করা।
- দ্রুতগামী গাড়ি ও বিমানের বডি স্ট্রিমলাইন (Streamline) বা সুষম ধারারেখা আকারে তৈরি করা।
ঘর্ষণ বাড়ানোর উপায়:
- যানবাহনের টায়ার ও জুতোর নিচে বিশেষ খাঁজ (Grooves) কাটা রাখা।
- পিচ্ছিল মেঝে বা রাস্তায় বালি ছিটানো।
- স্পর্শরত তল দুটিকে পরস্পরের ওপর আরও জোরে চেপে ধরা (অভিলম্বিক বল বৃদ্ধি)।
৪. ঘর্ষণ একটি প্রয়োজনীয় উপদ্রব (Friction is a Necessary Evil)
ঘর্ষণের কারণে মেশিনের যন্ত্রাংশ ক্ষয় হয় এবং প্রচুর তাপ ও শক্তির অপচয় ঘটে—এই দিক থেকে ঘর্ষণ ক্ষতিকর। কিন্তু ঘর্ষণ না থাকলে মানুষ মাটিতে হাঁটতে পারত না, গাড়ি ব্রেক করে থামানো যেত না, দিয়াশলাই জ্বলত না এবং খাতায় কলম দিয়ে লেখাও সম্ভব হতো না। এজন্য পদার্থবিজ্ঞানে ঘর্ষণকে "প্রয়োজনীয় উপদ্রব" বলা হয়।
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন: ঘর্ষণকে 'প্রয়োজনীয় উপদ্রব' (Necessary Evil) বলা হয় কেন?
ঘর্ষণের উপকারিতা: ঘর্ষণ না থাকলে জুতো পিছলে যেত এবং আমরা মাটিতে হাঁটতেই পারতাম না; চলন্ত গাড়ি ব্রেক করে থামানো যেত না; দেয়ালে পেরেক আটকে থাকত না এবং কাগজের ওপর কলম দিয়ে লেখা সম্ভব হতো না।
সুতরাং, ক্ষতি থাকা সত্ত্বেও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘর্ষণ অপরিহার্য হওয়ায় একে 'প্রয়োজনীয় উপদ্রব' বলা হয়।